সাজেক ভ্রমণ


প্রকাশিত:
৩ জানুয়ারী ২০১৯ ১৭:১৫

Print Friendly and PDF
হাসিব উদ দৌলা

তারিখটা ছিল ডিসেম্বর এর ২৬ থেকে ২৮, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে। ২৫ শে ডিসেম্বর রাতে শ্যামলী পরিবহনের আরামবাগ ঢাকা কাউন্টার থেকে যাত্রা শুরু করি আমরা ৩ কাপল। আর সাথে একমাত্র বেবি আমার সাড়ে তিন বছরের কন্যা হানিয়া। সকালে খাগড়াছড়ি পৌছাতেই সকাল প্রায় ৯টা বেজে গেলো। ফলে নাস্তা প্রায় না করেই আগে থেকে ঠিক করে রাখা চান্দের গাড়ী বা জিপ গাড়ির পথ ধরলাম। কারণ সকাল ১০ টার মধ্যে বাঘাইছড়ি আর্মি চেকপোস্ট এ পৌছতে না পারলে সকালের কনভয় ধরা যাবে না, তখন আবার বিকেল ৩ টা পর্যন্ত আটকে যাবো। যাই হোক চেকপোস্টে যেতে যেতে সকাল ১০.৪০ বেজে গেলো। আটকে গেলাম। কিন্তু আর্মি স্টাফ আশার বানী দিলেন যে আর্মির একজন মেজর ফ্যামিলিসহ একই গন্তব্যে যাবেন আমাদের জীপ ও সেই সাথেই যেতে পারবে।

যাত্রা শুরু করলাম প্রায় দুপুর ১২ টার দিকে। যাত্রা পথেই প্রকৃতি তার রুপ দেখাতে শুরু করলো। পাহাড়ী আকা-বাকা পথ ধরে জীপ গাড়ীর ছুটে চলা দেখতে দেখতে রোমঞ্চকর অনুভূতির শুরু এখান থেকেই। সাজেক ভ্যালীর চুড়ায় গিয়ে পৌছলাম ততক্ষনে ভর দুপুর গড়িয়ে গেল। ম্যাডভেঞ্চার রিজোর্টের রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়েই লাঞ্চে বসে যাই মনটানা রেস্তোরায়। খাবার সেরে হালকা চা এর আড্ডার পর বিকেলের দিকেই বেরিয়ে পড়ি কংলাক জয়ের উদ্দেশ্যে। হালকা হিল ট্রেকিং করেই উঠে যাই সাজেক এর সর্বোচ্চ চুড়া হিসেবে খ্যাত কংলাক এর চুড়ায়। শীতের পড়ন্ত বিকেলের মিস্টি আলোয় কংলাক চুড়া থেকে চারিধারের ছোট বড় পাহাড় গুলোকে যে কি অপূর্ব লাগছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একেবারে গোধূলি কাটিয়ে সন্ধ্যের পর নেমে এলাম ভ্যালীতে। রাতের খাবারে ব্যাম্বো চিকেন আর বার্বিকিউ চিকেন আর পরোটা খেয়ে দিলাম ঘুম।

২৭.১২.২০১৮ ইং ভোর ৫.৩০ এর এলার্মে ঘুম ভাংতেই ফযর নামাজের পর রিজোর্টের বারান্দায় যেতেই যা দেখলাম তাতেই মনে এতদূরের জার্নি করে আসা আর খরচ করা সমস্ত পয়সা উসুল... আসলেই গরম চা এর কাপ হাতে এরকম একটা ভোর হতে দেখতে পারাটা আসলেই অনেক ভাগ্যের ব্যাপার... ইশ প্রতিটা ভোর যদি এমনভাবে দেখতে পারতাম। কার্পাস তুলোর মত ধবধবে সাদা মেঘগুলো উড়ে যাচ্ছে ঠিক আমাদের গা ঘেষেই এবং তা আমাদের অনেকটা নীচে দিয়ে। দেখলেই মনে হয় যেন মেঘের উপর দিয়ে আলিফ লায়লার চরিত্রগুলোর মত আমরাও হেটে চলে যেতে পারবো.... উফ... প্রকৃতির এই রুপ শুধু চোখে দেখে হৃদয়ে ধারণ করা সম্ভব.... ক্যামেরাবন্দী করে এর অনুভূতি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। দেখতে দেখতে চোখের সামনেই সুর্য্যি মামা উদিত হলেন আর তার দ্যুতি ছড়াতে শুরু করলো আর সকালের আবহ টা পরিবর্তিত হয়ে আরেক ধরণের সৌন্দর্য্য প্রকাশ পেতে শুরু করলো।

এবার সকাল টা আরেকটু ভালোভাবে উপভোগ করার জন্য আমরা বেরিয়ে পড়ি হেলিপ্যাড এর উদ্দেশ্যে। হেলিপ্যাডের উপর থেকে চারপাশটা আরো সুন্দর করে উপভোগ করা যায় আর বুক ভরে তাজা শ্বাস নিয়ে নিজেকে অনেক হালকা মনে হয়। এর ফাকে ঝাড়ভোজ নামে আর্মির একটা স্পেস আছে সেটা ঘুরে দেখে নিলাম। এরপর সকালের নাস্তাটা সেরে আবার বেরিয়ে পড়লাম হাটাহাটি করতে আর অন্য রিজোর্টগুলো থেকে কেমন ভিউ পাওয়া যায় তা আবিষ্কার করতে। এর মধ্যেই রওনা দিয়ে ফেলি ভ্যালীর উত্তর পাশ দিয়ে ঝরনার পথে, কিন্তু স্থানীয়দের মতে ঝরনায় এখন পানি অনেক কম থাকায় আর সাথে বেবি থাকায় তাদের উপদেশেই কিছুটা ট্রেকিং করেই ফিরে এলাম ভ্যালীতে। দুপুরে হাশের গোস্ত দিয়ে লাঞ্চ সেরে হালকা বিশ্রাম নিলাম। বিকেলটা বেশ ভালোই কাটালাম আর্মির নির্মিত স্টোন গার্ডেনে গোধূলিটা বেশ ভালোই কাটে এখানে। মাগরিবের নামাজের পর তানিয়া ম্যাডামের কাছে খবর পেলাম পেলাম হেলিপ্যাডের গোড়ায় নাকি ব্যাম্বো টি পাওয়া যায়। আর দেরী না করে সদলবলে হাজির হলাম সেই স্টলে। অসাধারণ স্বাদের ঐতিহ্যবাহী সেই চা যেন পান না করলেই নয় আর সাথে আড্ডা তো আছেই। রাতের খাবারে এবার বেশ কান গরম করা ঝালের স্পেশাল ব্যাম্বো বিরিয়ানি। আবার হালকা আড্ডা তারপর ঘুম।
২৮.১২.২০১৮ ইং তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে আরো একটা সুন্দর ভোর উপভোগ করার সুযোগ ছাড়িনি কিন্তুক। এরপর সকালটা হেলিপ্যাডে কাটিয়ে নাস্তাটা সেরেই ফেরার জীপে চড়ে বসলাম। ফেরার পথে খাগড়াছড়িতে পৌছার পথেই হাজাছড়া ঝরনাতে কিছুটা ভালো সময় কাটাই। শহরে ফিরে পরপর ঝুলন্ত ব্রীজ আলুটিলা গুহা তারেং পাহাড়ের চুড়া ঘুরতেই প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গেলো। এরপর দুই কাপল ঢাকার বাসে উঠে ভ্রমণের সমাপ্তি টানলেন আমরা এক কাপল আর আমাদের কন্যাও চট্টগ্রামের বাসে উঠে ভ্রমণটা শেষ করে আরেকটা যাত্রা শুরু করলাম।

#খরচ:
***চান্দের গাড়ীকে২৬ তারিখ সকাল (খাগড়াছড়ি বাস স্টপ) থেকে ২৮তারিখ সন্ধে (খাগড়াছড়ি বাস স্টপ) পর্যন্ত সেবা দেয়ার জন্য দিয়েছি মোট ৯২০০/-
***রিজোর্ট ভাড়া ছিল কাপল রুম ২০০০/- (দিন প্রতি) অমরা ২ দিন ছিলাম।
***খাবার খরচ প্রতি কাপল প্রায় ১২০০/- (দিন প্রতি)
***ঢাকা-খাগড়াছড়ি-ঢাকা বাস ভাড়া কাপল প্রতি প্রায় ৩৫০/- (এসি+নন এসি)
***সব মিলিয়ে ‍আমাদের ৩ কাপলের প্রতি কাপলের খরচ হয়েছে প্রায় ১৩০০০/-

#বি_দ্র: আমাদের পুরো ভ্রমণে আমরা প্রকৃতির বুকে প্লাস্টিক, পলিথিন বা অপচনশীল কোন বস্তু ফেলে দুষণ করিনি একটুও। ঘুরতে আপনারাও পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু ফেলে আসবেন না সেই কামনায় #হ্যাপী_ট্রাভেলিং