পণ্যের মানে আপোষ করিনি, ঘটনার তদন্ত হবে: ‘লাইক ইট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক

খাদ্যে ভেজাল, সিলেটে ৪৮ শিক্ষার্থী হাসপাতালে


প্রকাশিত:
২১ এপ্রিল ২০১৬ ১৯:২৫

Print Friendly and PDF

অল্প সময়ে ভোক্তাদের কাছে জনপ্রিয়তা পাওয়া নতুন ব্র্যান্ড ‘লাইক ইট’-এর বিরুদ্ধে খাদ্য পণ্যে ভেজালের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল ২১ এপ্রিল সিলেটের মধু শহীদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত ক্লাস পার্টিতে ‘লাইক ইট’ মুগ ডালভাজা খেয়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে।

এদের মধ্যে ৪৮ জন শিক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে এদের মধ্যে কারও অবস্থা গুরুতর নয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালে আসা প্রায় সব শিক্ষার্থীরাই বমি করছিলেন। ডিউটি চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে বিষয়টিকে গণ ‘ফুড পয়জনিং’ বলে চিহ্নিত করছেন।

এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সী বিভাগের দায়িত্বরত ডা. ওমর ফারুকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ‘আমরা এক সাথে এতো শিক্ষার্থীর অসুস্থ্য হয়ে হাসপাতালে আসার ঘটনায় খুবই উদ্বিগ্ন হই। শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে আমরা জানতে পারি তাদের ক্লাস পার্টি চলছিলো এবং সেখানে তারা ‘লাইক ইট’ ব্র্যান্ডের মুগ ডাল ভাজা খেয়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা আমাদের জানান, ডাল ভাজা খাওয়ার খানিক পর থেকেই তাদের শরীর খারাপ লাগতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তারা বমি করতে থাকে। স্কুল কর্তৃপক্ষ বিলম্ব না করে অসুস্থ্য শিক্ষার্থীদেরকে দ্রুত চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসার সাথে সাথে আমরা তাদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করি। এ ধরণের গণ পেটের পীড়া দেখে আমরা অনুমান করছি ‘লাইক ইট’ মুগ ডাল ভাজায়, শিশু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো উপাদান থাকতে পারে যেটার কারণে এক সাথে সবার পেটের পীড়া হয়েছে। তবে ভালো খবর হলো, কোনো শিক্ষার্থীর অবস্থা গুরুতর নয়। প্রাথমিক চিকিৎসা এবং ঔষধ দেয়ার পর শিক্ষার্থীরা সবাই এখন সুস্থ্য আছে। আমরা আজকের দিনটা সবাইকে অবজারভেশান এ রাখবো। আশা করছি কাল সকালের মধ্যে সবাই বাড়ি ফিরতে পারবে।’

অসুস্থ্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা এই ঘটনার সুষ্ঠ পুলিশি তদন্ত দাবি করেন। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের অনেকেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র রিজওয়ান আহমেদ (১০) এর অভিভাবক দেলোয়ার আহমেদ জানান, ‘লাইক ইট’ ভালো মানের খাদ্য পণ্য তৈরি করে বলে জানতাম। অনেক নামি-দামি ব্র্যান্ডের পণ্য বাদ দিয়ে বাচ্চাদের হাতে লাইক ইট-এর পণ্য তুলে দিয়েছি শুধুমাত্র এর গুণগত মান এবং স্বাদের কারণে। এতো অল্প সময়ে যদি তারা তাদের পণ্যের মান নিয়ে আপোষ করে ফেলে তাহলে সেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতোগুলো বাচ্চার জীবন আজ বিপন্ন হতে পারতো। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত দাবি করছি।’

মধু শহীদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান ঘটনার পর থেকে হাসপাতালে অবস্থান করছিলেন। এ ঘটনায় তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনা কখনোই কাম্য নয়। শিক্ষার্থীদের পছন্দেই ‘লাইক ইট’ ব্র্যান্ডের মুগ ডাল ভাজা ক্লাস পার্টির জন্য আনা হয়েছিল। কিন্তু সেটা খাওয়ার পর এক সাথে এতোগুলো শিক্ষার্থীর অসুস্থ্য হয়ে পড়াটা উদ্বেগজনক। আমরা এ বিষয়ে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’ ঘটনার তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছে।

‘লাইক ইট’ ইম্পিরিক্যাল কনজ্যুমার প্রোডাক্টাস লিমিটেডের একটি ব্র্যান্ড। অতি অল্প সময়ে কোম্পানিটির দুটি ব্র্যান্ড ‘গুডমিল’ এবং ‘লাইক ইট’ পণ্যের স্বাদ এবং গুণগত মানের জন্য ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ‘গুডমিল’ এবং ‘লাইক ইট’কে ইতোমধ্যে অনেকেই ফিউচার ব্র্যান্ড লিডার হিসেবে মানতে শুরু করেছিল। ঠিক সেসময়ে এই ধরণের ঘটনা ব্র্যান্ড দুটির উপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে অনেকেই ধারণা করছেন। এ ব্যাপারে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর নাওয়াজের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনা আমাদের জন্য প্রথম। এই মুহূর্তে আমরা সর্ব্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি শিক্ষার্থীদের সুস্থ্যতায়। বাচ্চাদের প্রয়োজনীয় সব ধরণের চিকিৎসা সেবা আমরা নিশ্চিত করবো। পণ্যের মানের ব্যাপারে আমরা কখনোই আপোষ করিনি। আমি নিজে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছি। আশা করছি প্রকৃত ঘটনা আপনাদের সামনে দ্রুত তুলে ধরতে পারবো।’

গত এক বছরে এই নিয়ে ৯০টিরও বেশি ঘটনায় খাদ্য ভেজালে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৭০০ এরও বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে রংপুরে একজন, ঠাকুরগাওয়ে দুই জন, বরিশালে একজন সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ পর্যন্ত ৯ জন মারা গেছে। এ তালিকায় সর্বাধিক মানুষ ‘প্রাণ’-এর বিভিন্ন খাদ্য পণ্য খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন যার ভেতরে ৫ জন এখন পর্যন্ত মারা গেছেন বলে বিভিন্ন সুত্র নিশ্চিত করেছে।