‘টাকা লাগানো’র হিড়িক পড়েছে


৮ জানুয়ারী ২০১৯ ১৩:৩৬

আপডেট:
৮ জানুয়ারী ২০১৯ ১৩:৩৯

ফাইল ফটো

পাড়ার চায়ের দোকান থেকে পড়ার টেবিল, ক্রিকেট প্রেমীদের এখন আলোচনার বিষয় বিপিএল। চার-ছক্কা আর রানের ফুলঝুরি দেখার জন্য মরিয়া দেশের ক্রিকেট প্রেমীরা। আইপিএলের রমরমা অবস্থা দেখে অন্য ক্রিকেট বোর্ডগুলাও একই ধারার টি-২০ লিগ চালু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে শুরু হয় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ-বিপিএল। আইপিএল-বিপিএল নামের সঙ্গে আরো একটি শব্দ জুড়ে গেছে, আর তা হলো জুয়া বা বাজি।

‘বিপিএল জুয়া’এখন আলোচিত নাম। শহর থেকে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে এই জুয়া। বিপিএল জুয়ারিদের ভাষায় ‘টাকা লাগানো’ ‘বাজি’। গত বছর রাজধানীতে এক ছাত্র খুনের কারণ ছিল এই জুয়া।

মিরপুরের তরুণ আলী হোসেন। তার ভাষায় ক্রিকেটে এখন অনেকেই টাকা লাগায়। চায়ের দোকান থেকে সুপার মার্কেট, এমনকি ঘরোয়া আড্ডায় ক্রিকেটে ‘টাকা লাগানোর ব্যবসা’ শুরু হয়েছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বা বিপিএল-এর শুরুতেই। টঙ্গী থেকে নাঈম জানান, ঢাকার অদূরে গাজীপুরে মোল্লা মার্কেট এলাকায় প্রতি খেলাতেই বসে জমজমাট এই ক্রিকেট জুয়া।

নাঈম আরো জানান, ‘‘প্রতি খেলাতেই মার্কেট এলাকার একটি ক্লাবে টাকা লাগানো হয়। ৩০ থেকে ৪০ জন বাজিতে অংশগ্রহণ নেন। একেকজন দলপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বাজি ধরেন। টাকা জমা রাখা হয় একজনের কাছে। যারা জেতেন তারা টাকা নিয়ে যান। দলের সক্ষমতা অনুযায়ী বাজির টাকা ওঠা-নামা করে থাকে। সূত্র বলছে, ‘‘ক্লাবে ছোট-বড় অনেকগুলো টিভি সেট আছে। সেখানে গোল হয়ে খেলার সময় তারা বসে থাকে।” তিনি আরো জানান, ‘‘এমনকি চায়ের দোকান আর ছোট-খাট আড্ডাতেও এই টাকা লাগানো হয়। এখানে মূলত বল প্রতি, প্লেয়ার প্রতি এবং ওভার প্রতিও বাজি ধরা হয়। ওই এলাকার তরুণরা, বিশেষ করে কলেজের ছাত্ররা টাকা লাগায়। এছাড়া রিকশা চালক, দোকানদার, বেকার যুবক এরাও এখন এই টাকা লাগানোর খেলায় মেতেছে।” পুলিশ আসে কিনা জানতে চাইলে নাঈম জানান, ‘‘পুলিশ আসে না।

ঢাকার ইস্কাটন এলাকার চা দোকানি মো. সোলায়মান জানায়, ‘‘খেলার আগে-পরে আমার দোকানে চা খেতে এসে আড্ডা দেয় অনেকেই। ওই আড্ডার আলোচনাতেই আমি জানতে পারি বিপিএল জুয়ার কথা। এই এলাকার কিছু মেস বাড়ি এবং কিছু বাসায় তরুণরা খেলার সময় বাজি ধরে। ‘গেম' বাজি নিয়ে মাঝে-মধ্যে ঝামেলাও হয়। ঝামেলা একদিন আমার দোকান পর্যন্ত এনেছিল তারা। পরে তাদের এক সিনিয়র মিটমাট করে দেয়।'' খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার মতিঝিল ও শান্তিনগরের ক্লাব পাড়ায় খেলা নিয়ে বাজি নামের এই জুয়া আগে থেকেই প্রচলিত। বিপিএল এর সাথে ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং আইপিএল নিয়েও এখানে জুয়া খেলা হয়। ক্লাবগুলোতে আলাদা আলাদা গ্রুপ করে এই জুয়া ধরা হয়। এ জন্য ক্লাবের ভেতরে প্রয়োজন অনুযায়ী টিভি সেট বসানো হয়। আর জুয়ার টাকা নিয়ন্ত্রণ এবং ভাগ বাটোয়ারা করেন ক্লাবের দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

দেশের জেলা ও বিভাগীয় শহর ছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই ক্রিকেট জুয়া ছড়িয়ে পড়েছে। খুলনা যশোর, সাতক্ষীরা এবং বরিশাল অঞ্চলে বিভিন্ন লোকের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, ওই সব এলকার চায়ের দোকান, হোটেল, ক্লাব, সবখানেই খেলার সময় বাজি ধরার নামে এই জুয়া চলে। এমনকি জুয়ায় মানুষকে আকৃষ্ট করতে আছে নানা তৎপরতাও। কেউ কেউ ফেসবুকে আমন্ত্রণ জানায় জুয়া খেলার জন্য। এ নিয়ে ফেসবুকে বেশ কয়েকটি ‘ক্লোজড গ্রুপ'-এর কথাও জানা যায়৷

অনলাইনে খেলাধুলা নিয়ে সক্রিয় নোমান আহমেদ নামে এক তরুণ জানান, ‘‘বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে অনলাইনেও জুয়া খেলা হয়। আন্তর্জাতিক জুয়াড়িরা নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে এই জুযার আসর বসায়।

বাংলাদেশের অনেকেই ওই জুয়ায় অংশ নেয়। তবে বিপিএল নিয়ে অনলাইনে জুয়া আছে বলে আমার জানা নাই। কিন্তু খেলার সময় বাজি ধরা এখন একটা সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে৷''

তবে ক্রিকেট নিয়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্র জানান, ‘‘বেটিং সাইটগুলো সারা দুনিয়ার মতো বাংলাদেশেও সক্রিয়। ভাল দল ও ম্যাচ থাকলে বাংলাদেশের খেলা নিয়েও জুয়া হয় এসব সাইটে। বিপিএল-এ ঢাকার টিমের খেলার সময় জুয়া হয়েছে'' তাছাড়া ঢাকা শহরের গুলশান, ধানমন্ডী বা উত্তরার বিভিন্ন অভিজাত খাবারের রেস্তরা গুলোতে বড় পর্দার খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর এর ফাঁকেই প্রায় প্রকাশ্য চলছে বিপিএল নিয়ে বাজি। গুলশানের কয়লা, ধানমন্ডির টেস্ট বা উত্তরার ফরচুর ঘুরে বিপিএল চলাকালীন অনেককে বিভিন্ন পরিমানে জুয়া বা বাজি ধরতে দেখা গেছে।

বাংলাদেশে এখন যে বিপিএল জুয়া ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা ‘হোমগ্রোন' বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান দাবি করেন, ‘‘আমরা এখনো বিপিএল জুয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট খবর বা তথ্য পাইনি। তবে এ ব্যাপরে সতর্ক আছি আমরা। কোনো অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেব।”

কান্ট্রিনিউজ২৪/আরআর/এমআর