টাঙ্গাইলের গ্রাম্যমেয়ে কৃষ্ণা রাণী ফুটবলের রাজকন্যা হওয়ার গল্প


কে এম মিঠু

Published: 2018-02-03 18:48:34 BdST | Updated: 2018-11-15 10:20:17 BdST

টাঙ্গাইল অফিস :: টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলা শহর থেকে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত একটি গ্রামের নাম উত্তর পাথালিয়া। প্রত্যন্ত এই গ্রামে প্রবেশ করার আগে পশ্চিমে ঝিনাই নদী আর পূর্বে বির্স্তীন ডগাবিল। গ্রাম ভেদ করে চলে যাওয়া মুশুদ্দী-ঝাওয়াইল সড়কের প্রাচীন এক বটবৃক্ষ বাঁয়ে রেখে একশ’গজ সামনে এগুলেই দারিদ্রতার ছাঁপে জর্জরিত একটি টিনের বাড়ি। অচল পয়সার মতো অবহেলার ছোট এই টিনের বাড়িটি ঘিরেই এখন পাথালিয়া গ্রামের ছোট বড় সকলের পাশাপাশি উপজেলাসহ টাঙ্গাইল জেলাবাসীর গর্ব আর ব্যাপক উচ্ছ্বাস।

গর্ব আর উচ্ছ্বাস হবেই না কেন! কারন এ বাড়িটিইতো বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবলকে নতুন করে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা বাংলাদেশ জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা দলের অধিনায়ক এবং দলের অন্যতম বড় ভরসার নাম কৃষ্ণা রাণী সরকারের। একটি অঁজপাড়া গাঁয়ে কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা কৃষ্ণার সাফল্যে সারাদেশবাসীর কাছে সত্যিই অনেক প্রশংসনীয় এবং আনন্দের। কৃষ্ণা শুধু অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা দলের অধিনায়কই নয়। একই সঙ্গে দলের একজন নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ডও।

ছোটেবেলা থেকেই খেলাপাগল কৃষ্ণার ভিন্নমাত্রার আকর্ষণ ছিল ফুটবলের প্রতি। সারাক্ষণ কাকাতো ভাইদের সাথে আর গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ছেলেদের সঙ্গে মিলে ফুটবল খেলতো কৃষ্ণা। দিনের বেশির ভাগ সময় খেলা নিয়ে বাড়ির বাইরে থাকতো বলে মা প্রায়ই বকা দিতেন। পাড়াপড়শিরাও টিপ্পনী কাটতো। লেখাপড়ার প্রতি কিছুটা অমনোযোগী থেকে ফুটবল নিয়ে মাতামাতি করায় একবার কৃষ্ণার মা হাত থেকে বল কেড়ে নিয়ে বঁটি দিয়ে কুচি কুচি করে কেটে চুলায় পোড়ানো হয়েছিল! তা দেখে কৃষ্ণার কাকা পরে একটি ফুটবল কিনে দেন। এক পর্যায়ে ছেলেদের সঙ্গে মিলে ফুটবল খেলা বন্ধ করে দিলে কৃষ্ণা খাওদায়াওয়া ছেড়ে দেয়। পরে আশপাশের মেয়েশিশুদের নিয়ে বাড়ির ছোট আঙ্গিনায় ফুটবল চর্চার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু তাতেও কৃষ্ণাকে দমাতে পারেন না বাবা বাসুদেব চন্দ্র সরকার ও মা নমিতা রাণী সরকার।

ফুটবলে কৃষ্ণার হাতেখড়ি ২০১০ সালে উপজেলার পর্যায়ে বঙ্গমাতা ফজিলাতুনেচ্ছা মুজিব আন্তঃপ্রাথমিক ফুটবল টুর্নামেন্টে। কৃষ্ণার নের্তৃত্বে তার নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উত্তর পাথালিয়া সরকারি প্রাইমারি বিদ্যালয় উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। কৃষ্ণা সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়ায় সূতী ভিএম পাইলট মডেল হাইস্কুলের শরীর চর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপনের নজর পড়েন। তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে কৃষ্ণার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কৃষ্ণাকে সূতী ভিএম পাইলট মডেল হাইস্কুলে বিনাবেতনে ভর্তি করা হয়। আর এ স্কুলে ভর্তি হয়েই ফুটবল চর্চার অবাধ সুযোগ পেয়ে যায় কৃষ্ণা রাণী সরকার।

কৃষ্ণার ফুটবলার হওয়ার পেছনে বড় অবদান কাকার। সকালে ঘুম থেকে তুলে বাড়ি থেকে সাত কিলোমিটার দূরে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন। বাবার কাছে টাকা থাকত না। আসা-যাওয়ার ভাড়াটাও ওই কাকা দিতেন। এরপর উপজেলা পরিষদ থেকে সাইকেল দেওয়ার পর অনুশীলনে যেতে আর তত সমস্যা হয়নি। কৃষ্ণার বাবার একসময় দরজির দোকান ছিল। টাকার অভাবে অনেক আগেই দোকানটা বন্ধ করে দিয়েছেন বাসুদেব সরকার। এখন অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করছেন তিনি।

পরে গোলপুরের সূতী ভিএম পাইলট মডেল হাইস্কুল খেলায় কৃষ্ণার নৈপূণ্য আর বিশেষ ভূমিকায় জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ফুটবল প্রতিযোগিতা ২০১১, ২০১২ এবং ২০১৩ সালের পর পর তিনবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়। পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ বালিকা ফুটবল দল গঠন করা হলে কৃষ্ণাসহ একই স্কুল থেকে আরো দুই ফুটবলার বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ বালিকা ফুটবল দলে স্থান পান।

কৃষ্ণার নেতৃত্বে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক ফুটবলে ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। পরের বছর একই টুর্নামেন্টে শিরোপা পায় বাংলাদেশ। তবে সেই দলে বয়সের কারণে ছিলেন না কৃষ্ণা। কিন্তু একই বছর ঢাকায় হওয়া এএফসসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের বাছাইয়ে গ্রুপ পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্বে উত্তীর্ণ হয় বাংলাদেশের মেয়েরা। সেই দলের গর্বিত অধিনায়কও তিনি। একই সঙ্গে সেই আসরে ৮ গোল করে দলকে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দেন তিনি। ২০১৭ সালে কৃষ্ণার নেতৃত্বেই থাইল্যান্ডে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের মূল পর্বে খেলে এসেছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের প্রথম দিকে ভারতে হওয়া সাফ ফুটবলে রানার্সআপ হয় বাংলাদেশ। যে দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন কৃষ্ণা।

সারা বছর ঢাকায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ক্যাম্পেই এখন কাটাতে হয় তাকে। মাঝে মধ্যে ছুটিতে বাড়ি আসেন। ক’দিন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ বালিকা সাফে শিরোপা জিতেছে। বয়সের কারণে সেই দলে অবশ্য ছিলেন না কৃষ্ণা। তবে অনুজদের এই সাফল্যের ভাগিদার তারাও। তাদের পথ ধরেই যে এই সাফল্য। বাংলাদেশের মেয়েরা অনূর্ধ্ব-১৫ সাফের শিরোপা জেতার পরই ছুটিতে বাড়ি এসেছেন কৃষ্ণা। এমন সময় সরেজমিনে তার স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, কৃষ্ণা তার স্কুলের অন্যান্য বন্ধুদের সাথে খেলাধূলা করছেন। এমনকি অনেক শিক্ষার্থী সুযোগ পেলে কৃষ্ণার কাছ থেকে অটোগ্রাফও নিচ্ছেন। কৃষ্ণা হাসি খুশি মুখেই তাদেরকে সে আবদার মেটাচ্ছে।

নিজের ফুটবলার হওয়ার নানা বিষয় কৃষ্ণা রানী বলেন, ‘ছোট বেলা থেকেই আমার ফুটবল খেলার প্রতি আগ্রহ ছিল। আমি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ফুটবল খেলেছি। এক পর্যায়ে আমার সাফল্য এসেছে। আগে আমাকে অনেকেই নানান কথা বলেতা, কিন্তু এখন আর আমাকে তা বলে না। আমার দেখাদেখি আমাদের ক্যাম্পে এখন অনেকে ভালো ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। তবে আমার এই সাফল্যের পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান স্কুলের। স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাকে সহযোগিতা না করলে আমি আজ সেরা ফুটবলার হতে পারতাম না।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার বাবা একজন কৃষক। আমি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। দরিদ্র পরিবারের থেকে একজন ভালো মানের ফুটবলার হওয়া যায়। এতে নিজের আগ্রহ থাকতে হবে। এখন বর্তমানে নারীরা পিছিয়ে নেই।’

কৃষ্ণা রানী বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে আমাদের ব্যাপক সাফল্য এসেছে। আশা করছি নতুন বছরেরও আমাদের সাফল্য আসবে। সামনে আমাদের অনেকগুলো আন্তর্জাতিক আসর রয়েছে। আশা করছি আমরা এ টুর্নামেন্টে সফল হবো।’

সূতি ভিএম মডেল পাইলট হাইস্কুলের শরীর চর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপন বলেন, ‘কৃষ্ণা খুব দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও কঠোর পরিশ্রম এবং ইচ্ছা শক্তি থাকার ফলে আজ কৃষ্ণা সেরা ফুটবলার হতে পেরেছে। যা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাকে দেখে স্কুল এবং উপজেলার অনেক ক্ষুদে ছেলে মেয়েরা খেলাধূলায় আগ্রহী হচ্ছে। ভবিষ্যতেও কৃষ্ণা এমন সাফল্য ধরে রাখতে পারে এটিই প্রত্যাশা করছি।’

এ ব্যাপারে সূতি ভিএম মডেল পাইলট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আমরা কৃষ্ণার মতো সেরা ফুটবলার পেয়ে আনন্দিত। আমাদের স্কুল থেকেই কৃষ্ণার যাত্রা শুরু হয়। নারীরা আজ পিছিয়ে নেই সেটা আরো একবার প্রমান করেছে কৃষ্ণা।’

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


সারাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত


পাবনা ও নাটোর অঞ্চলে সমস্ত আম গাছে মুকুলের সমারোহ। বাতাসে ভাসছে মুকুলে...

সারাদেশ | 2018-02-25 16:58:17

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলা শহর থেকে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত একটি...

সারাদেশ | 2018-02-03 18:48:34

মিনারের উচ্চতা ৪৫১ ফুট (১৩৮ মিটার), যা ৫৭ তলা ভবনের সমান। গম্বুজ থাকছে...

সারাদেশ | 2018-01-22 20:08:26

মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি সে দেশ থেকে আসছে ইয়াবাও।...

সারাদেশ | 2017-09-28 13:00:25

ভারতে পাচারকালে বেনাপোলের ঘিবা সীমান্ত থেকে আজ সকালে ১৮ পিচ সোনার বারস...

সারাদেশ | 2017-10-17 11:38:18

মাগুরার শালিখা উপজেলার গজদূর্বা গ্রামে গতকাল বৃহস্পতিবার আধিপত্য বিস্...

সারাদেশ | 2017-11-02 18:26:49

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে ভারতীয় জেলেরা ইলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে...

সারাদেশ | 2017-10-01 12:25:54

বাংলাদেশে এই প্রথম চালু হলো রোবট রেস্টুরেন্ট। এই রেস্টুরেন্টে কোনো মান...

সারাদেশ | 2017-11-15 19:42:08