প্রথম পর্বঈমান বিনষ্টকারী ও ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমল


ড. মাওলানা মো: হাবিবুর রহমান

Published: 2018-11-01 09:09:38 BdST | Updated: 2018-11-16 15:26:21 BdST

মানুষের দুনিয়ার জীবনের আমল বা কর্ম দুইভাগে বিভক্ত (ক) আমলে সালেহ বা ভালো আমল যা মানুষের ঈমানের জন্য সহায়ক বা ঈমান বৃদ্ধিকারী (খ) আমলে সাইয়্যেয়াত বা খারাপ আমল যা মানুষের ঈমান বিনষ্ট করে দেয়। যে ব্যক্তি ভালো আমল করবে আল্লাহ তার উত্তম প্রতিদান দিবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كَبِيرًا “যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।” (সূরা বনি ইসরাঈল-৯) আরো বর্ণিত হয়েছে, وَيُبَشِّرَ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا حَسَنًا “যারা সৎকর্ম করে, নিশ্চয় তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।” (সূরা কাহাফ-২)
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর সাথে কুফ্রী করবে এবং খারাপ আমল করবে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا “আর তাওবা নাই তাদের, যারা অন্যায় কাজ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু এসে যায়, তখন বলে, আমি এখন তাওবা করলাম, আর তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা কাফির অবস্থায় মারা যায়; আমি এদের জন্যই তৈরী করেছি যন্ত্রণাদায়ক আযাব। ” (সূরা আন-নিসা-১৮)
আলোচ্য প্রবন্ধে আল-কুরআন ও আল-হাদীসের আলোকে ঈমান বিনষ্টকারী ও ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমলের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা হলো:

নিজের মতামত ও সিদ্ধান্তকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এর সিদ্ধান্তের চেয়ে অগ্রাধিকার দেয়া :
ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি বদ আমল হচ্ছে নিজের মতামত ও সিদ্ধান্তকে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের (সা.) এর সিদ্ধান্তের উপরে অগ্রাধিকার দেওয়া। এ ধরণের কাজ ঈমান ও আমল সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রবর্তী হয়ো না এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-হুজুরাত- ১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ “হে ঈমানদারগণ, তোমরা নবীর আওয়াজের উপর তোমাদের আওয়াজ উঁচু করো না এবং তোমরা নিজেরা পরস্পর যেমন উচ্চস্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সেরকম উচ্চস্বরে কথা বলো না। এ আশঙ্কায় যে তোমাদের সকল আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।” (সূরা আল-হুজুরাত- ২)

উপদেশ অনুযায়ী কাজ না করা :
ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের মধ্যে আর একটি বদ আমল হচ্ছে কোন ব্যক্তি মানুষকে যে উপদেশ বা নসিহত করে অথচ নিজে সম্পূর্ণরূপে তা ভুলে থাকে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ “তোমরা কি মানুষকে ভালো কাজের আদেশ দিচ্ছ আর নিজেদেরকে ভুলে যাচ্ছ? অথচ তোমরা কিতাব তিলাওয়াত কর। তোমরা কি বুঝ না?” (সূরা আল-বাকারা- ৪৪)
এজাতীয় খারাপ আমলকে আল্লাহ খুবই অপছন্দ করেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ “হে ঈমানদারগণ, তোমরা তা কেন বলো, যা তোমরা কর না? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর নিকট বড়ই ক্রোধের বিষয়।” (সূরা আস-সাফ- ২-৩)
এজাতীয় আমলকারীকে বলা হয় মুনাফিক। আর মুনাফিকদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি। আল্লাহ বলেন, إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا “নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। আর তুমি কখনও তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না।” (সূরা আন-নিসা- ১৪৫)

আমানতের খেয়ানত করা :
ঈমান ধ্বংসকারী বদ আমলের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আমনতের খেয়ানত করা। আমানতের খেয়ানত করতে নিষেধ করে রাসূল (সা.) বলেন, أَدِّ الأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ وَلاَ تَخُنْ مَنْ خَانَكَ “তোমাকে বিশ্বস্ত মনে করে যে ব্যক্তি তোমার কাছে আমানত রাখবে, তার আমানত ফিরিয়ে দাও। আর যে ব্যক্তি তোমার সাথে খেয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা করবে, তুমি তার সাথে খেয়ানত ও বিশ্বাস ঘাতকতা করবে না।” (সূনান আবু দাউদ ও তিরমিযি)
কারো হক নষ্টকারীকে বা খিয়ানতকারীকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ ্র أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ গ্ধ. قَالُوا الْمُفْلِسُ فِينَا يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ لاَ دِرْهَمَ لَهُ وَلاَ مَتَاعَ. قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- ্র الْمُفْلِسُ مِنْ أُمَّتِى مَنْ يَأْتِى يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلاَتِهِ وَصِيَامِهِ وَزَكَاتِهِ وَيَأْتِى قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فَيَقْعُدُ فَيَقْتَصُّ هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْتَصَّ مَا عَلَيْهِ مِنَ الْخَطَايَا أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِى النَّارِ “রাসূল (সা.) সাহাবীদের বললেন, তোমরা কি জানো প্রকৃত দরিদ্র কে? সাবাহীরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) যার টাকা-পয়সা ও দুনিয়ার সম্বল নেই সে। রাসূল (সা.) বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সেই প্রকৃত দরিদ্র, যে কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম, যাকাতসহ উঠবে। ঠিক তার সাথে কাউকে অভিশাপ করেছে, কাউকে আঘাত করেছে, অন্যায়ভাবে অন্যের মাল আত্মসাত করেছে, কাউকে প্রহার করেছে। কিয়ামতের দিন এটার কারনে তাকে দাড় করানো হবে এবং বলা হবে, এরা তোমার কাছে পাওনাদার তাদের প্রাপ্য তোমার ভালো কাজ দ্বারা পরিশোধ করো। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধের পূর্বেই তার ভালো আমল সব শেষ হয়ে যাবে। তখন এসব পপের কারনে তাকে ধরা হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সুনান আত-তিরমিযি ও মুসনাদ আহমদ)

মানুষের উপরে জুলুম বা অত্যাচার করা :
ঈমান বিনষ্টকারী বর্জনীয় আমলের মধ্যে আর একটি আমল হচ্ছে মানুষের উপরে জুলুম-অত্যাচার করা। কিয়ামতের দিন জুলুমকারীকে তার কর্মের প্রতিফল ভোগ করতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لْيَوْمَ تُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ وَأَنْذِرْهُمْ يَوْمَ الْآزِفَةِ إِذِ الْقُلُوبُ لَدَى الْحَنَاجِرِ كَاظِمِينَ مَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ حَمِيمٍ وَلَا شَفِيعٍ يُطَاعُ “আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অর্জন অনুসারে প্রতিদান দেয়া হবে। আজ কোন যুলুম নেই। নিশ্চয় আল্ল¬াহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। আর তুমি তাদের আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। যখন তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে দুঃখ-কষ্ট সংবরণ অবস্থায়। যালিমদের জন্য নেই কোন অকৃত্রিম বন্ধু, নেই এমন কোন সুপারিশকারী যাকে গ্রাহ্য করা হবে।” (সূরা মু’মিন- ১৭-১৮)
রাসূল (সা.) জুলুমের শাস্তি সম্পর্কে বলেছেন, مَنْ ظَلَمَ قِيدَ شِبْرٍ مِنَ الأَرْضِ طُوِّقَهُ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ “যে ব্যক্তি অত্যাচার করে এক বিঘত পরিমাণ জমিন গ্রহণ করবে, (কিয়ামতের দিন) তার গলায় সাত তবক জমিন পরিধান করানো হবে।” (সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম)

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা :
ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের মধ্যে অন্যতম একটি বর্জনীয় আমল হচ্ছে নিজের আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ يَنْقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ “আর যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যে সম্পর্ক অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের জন্যই লা‘নত আর তাদের জন্যই রয়েছে আখিরাতের মন্দ আবাস।” (সূরা রা‘আদ- ২৫)
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবীরা গুনাহ। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, الْكَبَائِرُ الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ وَقَتْلُ النَّفْسِ وَالْيَمِينُ الْغَمُوسُ “কবীরা গুনাহ হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, পিতা-মাতার নাফরমানি করা, কোন মানবকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা শপথ করা।” (সহীহ আল-বুখারী)

পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া :
আল্লাহর ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার হক আদায় করার ব্যাপারে আল-কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা ঈমানের পরিপন্থী। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ثَلاَثًا قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ “আমি কি তোমাদের সর্বাপেক্ষা বড় পাপ সম্পর্কে অবহিত করব না? কথাটি তিনি তিনবার বললেন। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) অবশ্যই আপনি বলে দিন। তিনি বলেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা আর পিতা-মাতার নাফরমানি করা।” (সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
লোক দেখানো আমল করা :
মানুষকে খুশি করার জন্য কোন আমল করা হচ্ছে ঈমানের পরিপন্থি। এ আমল তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে খতিগ্রস্থ করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ وَيَمْنَعُونَ الْمَاعُونَ “অতএব সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য দুর্ভোগ, যারা নিজেদের সালাতে অমনোযোগী, যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে এবং ছোট-খাট গৃহসামগ্রী দান করতে নিষেধ করে।” (সূরা আল-মাউন- ৪-৭)
লোক দেখানো আমলের কুফল সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, إِنَّ فِي جَهَنَّمَ لَوَادِ يَسْتَعِيذُ جَهَنَّمُ مِنْ ذَلِكَ الْوَادِي فِي كُلِّ يَوْمٍ أَرْبَعَ مِائَةِ مَرَّةٍ , أُعِدَّ ذَلِكَ الْوَادِي لِلْمُرَائِينَ مِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لِحَامِلِ كِتَابِ اللَّهِ وَلِلْمُصَّدِّقِ فِي غَيْرِ ذَاتِ اللَّهِ وَلِلْحُجَّاجِ إِلَى بَيْتِ اللَّهِ وَلِلْخَارِجِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ. “জাহান্নামে এমন একটি প্রান্তর আছে যা থেকে স্বয়ং জাহান্নামই প্রতিদিন চারশত বার পানাহ চায়। এ প্রান্তরটি তৈরী করা হয়েছে উম্মতে মুহাম্মাদীর ঐ সব রিয়াকার লোকদের জন্য, যারা আল্লাহর কিতাবের আলিম, দান খয়রাতকারী, আল্লাহর ঘরের হাজী এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী।” (আল-মু’জামুল কুবরা)

অন্যের হক নষ্ট করা ও যুলুম করা :
অন্যের অধিকার নষ্ট করা মস্তবড় অন্যায় কাজ যা মানুষের ঈমান ধ্বংস করে দেয়। এ ধরনের অন্যায়কারীকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, دَعَا لأُمَّتِهِ عَشِيَّةَ عَرَفَةَ ، بِالْمَغْفِرَةِ فَأُجِيبَ : إِنِّي قَدْ غَفَرْتُ لَهُمْ ، مَا خَلاَ الظَّالِمَ ، فَإِنِّي آخُذُ لِلْمَظْلُومِ مِنْهُ “রাসূল (সা.) আরাফার সন্ধ্যায় নিজ উম্মতের জন্য দো‘আ করেন। আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এর জবাব আসে, তোমার দো‘আ আমি কবুল করলাম, তোমার উম্মতের পাপ আমি ক্ষমা করে দেব। তবে যারা অন্যের অধিকার হরণ করেছে, তাদের মুক্তি নেই। আমি যালিমের কাছ থেকে মযলুমের অধিকার অবশ্যই আদায় করে দেবো।” (সূনান ইব্ন মাযা)
মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যাবাদীদের সাথে থাকা :
মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যাবাদীদের কাজে সহযোগিতা করা ঈমান বিনষ্টকারী আমলের অন্যতম। কারন আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সত্যবাদীদের সাথে থাকতে এবং মিথ্যা পরিহার করতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ “হে মু’মিনগণ, তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।” (সূরা আত-তাওবা-১১৯)
মিথ্যার পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِى إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِى إِلَى النَّارِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ حَتَّى يُكْتَبَ كَذَّابًا “মিথ্যা পাপের পথ দেখায় আর পাপ দোযখের আগুনের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ মিথ্যার অনুসরণ করতে করতে অবশেষে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী নামে লিপিবদ্ধ হয়।” (সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম)

দ্বীনের মধ্যে নতুন বিষয়ের উদ্ভাবন করা :
ঈমান বিনষ্টকারী বর্জনীয় আর একটি আমল হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিস্কার করা বা বিদাআত করা। আল্লাহ তাআলা বিদআত করা থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিয়ে আমাদেরকে বলেন, وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ “আর এটি তো আমার সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।” (সূরা আল-আনআম- ১৫৩)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ، فَإِنَّ شَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ “আমি তোমাদেরকে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু ঢুকিয়ে দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করছি। কারণ খারাপ বিষয় হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু তৈরী করা। আর দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে বিদাআত, আর প্রত্যেক বিদাআত হচ্ছে ভ্রষ্ঠতা।” (সূনান ইব্ন মাযা)

অত্যাচারীকে সাহায্য করা :
অত্যাচারীকে সাহায্য করা ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের অন্যতম। কারন ইসলামে অত্যাচারীকে সাহায্য করার কোন সুযোগ দেওয়া হয়নি। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, مَنْ مَشَى مَعَ ظَالِمٍ يُقَوِّيهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ ظَالِمٌ فَقَدْ خَرَجَ مِنَ الْإِسْلَامِ “যে ব্যক্তি জেনে শুনে কোন অত্যাচারীকে সাহায্য করে শক্তি যোগাবে, সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।” (বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান)
ধার-কর্জ নেওয়া জিনিস ফেরত না দেওয়া :
ধার-কর্জ নেওয়া জিনিস ফেরত না দেওয়া ঈমানের পরিপন্থি আমলের অন্যতম। কারন রাসূল (সা.) কোন জিনিস কর্জ নিয়ে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, الْعَارِيَةُ مُؤَدَّاةٌ وَالْمِنْحَةُ مَرْدُودَةٌ وَالدَّيْنُ مَقْضِىٌّ وَالزَّعِيمُ غَارِمٌ “ধারে নেয়া জিনিস, দুধ খাওয়ার জন্য প্রদত্ত জন্তু ও ঋণ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। আর যে ব্যক্তি কারো জামিন হবে তাকে তার জামানত অবশ্যই ফেরত দিতে হবে।” (সূনান আবু দাউদ)
উত্তারাধিকারীকে প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা :
উত্তারাধিকারীকে তার প্রাপ্য ওয়ারিশ থেকে বঞ্চিত করা বড় ধরনের অন্যায় কাজ। আর যে ব্যক্তি উত্তারাধিকারীর হক হঞ্চিত করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে জান্নাতের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, مَنْ فَرَّ مِنْ مِيرَاثِ وَارِثِهِ ، قَطَعَ اللَّهُ مِيرَاثَهُ مِنَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ “যে ব্যক্তি তার উত্তারাধিকারীকে প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের উত্তারাধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন।” (সূনান ইব্ন মাযা)
সুদ ও ঘুস খাওয়া :
সুদ ও ঘুস খাওয়া ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমল। এ কাজ আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার শামিল। আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ “হে মু’মিনগণ, তোমরা আল্ল¬াহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মু’মিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না কর তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও।” (সূরা আল-বাকারা- ২৭৮-২৭৯)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ “হে মু’মিনগণ, তোমরা বহুগুণ বৃদ্ধি করে সুদ খাবে না। আর তোমরা আল্ল¬াহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও।” (সূরা আলে-ইমরান- ১৩০)
সুদ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, لَعَنَ آكِلَ الرِّبَا ، وَمُوكِلَهُ ، وَشَاهِدِيهِ ، وَكَاتِبَهُ “যে সুদ খায়, যে খাওয়ায়, যে ব্যক্তি সুদের সাক্ষী হয় এবং যে ব্যক্তি এতদসংক্রান্ত বিবরণ কাগজে-পত্রে লিপিবদ্ধ করে, তাদের সকলকে রাসূল (সা.) অভিসম্পাত করেছেন।” (সূনান ইব্ন মাযা)
ঘুষ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي “ঘুষখোর ও ঘুষদাতা উভয়ের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।” (সূনান ইব্ন মাযা)

প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া :
প্রতিবেশীকে আচরণ ও কথার মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া ঈমান বিনষ্টকারী একটি খারাপ আমল। যদি কেউ ভালো আমল করে অথচ প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় সে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হবে। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, قَالَ رَجُلٌ : يَا رَسُولَ اللهِ ، إِنَّ فُلاَنَةَ يُذْكَرُ مِنْ كَثْرَةِ صَلاَتِهَا ، وَصِيَامِهَا ، وَصَدَقَتِهَا ، غَيْرَ أَنَّهَا تُؤْذِي جِيرَانَهَا بِلِسَانِهَا ، قَالَ : هِيَ فِي النَّارِ ، قَالَ : يَا رَسُولَ اللهِ ، فَإِنَّ فُلاَنَةَ يُذْكَرُ مِنْ قِلَّةِ صِيَامِهَا ، وَصَدَقَتِهَا ، وَصَلاَتِهَا وَإِنَّهَا تَصَدَّقُ بِالأَثْوَارِ مِنَ الأَقِطِ ، وَلاَ تُؤْذِي جِيرَانَهَا بِلِسَانِهَا ، قَالَ : هِيَ فِي الْجَنَّ “একজন ব্যক্তি রাসূল (সা.) কে বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), অমুক মহিলা প্রচুর নফল নামায, রোযা ও সদকার জন্য প্রসিদ্ধ, কিন্তু প্রতিবেশীকে কটু কথা বলার মাধ্যমে কষ্ট দেয়। রাসূল (সা.) বললেন, সে জাহান্নামে যাবে। লোকটি আবার বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), অমুক মহিলা সম্পর্কে খ্যাতি রয়েছে যে, সে খুবই কম নফল নামায, রোযা ও সদকা করে এবং দু’ একটা টুকরো সদকা করে থাকে। কিন্তু নিজের জিহবা দিয়ে কাউকে কষ্ট দেয় না। রাসূল (সা.) বললেন, সে জান্নাতে যাবে।” (মুসনাদ আহমদ)
অসৎ পথে ব্যবসা করা :
আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন তবে সে ব্যবসা সৎ পথে হতে হবে। অসৎ পথে ব্যবসা করার পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, إِنَّ التُّجَّارَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فُجَّارًا إِلاَّ مَنِ اتَّقَى اللَّهَ وَبَرَّ وَصَدَقَ “একমাত্র তাকওয়া ও সততা অবলম্বনকারী এবং সত্যবাদী ব্যতীত সকল ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন পাপী ও বদকার হিসেবে উত্থিত হবে।” (সূনান আত-তিরমিযি, সুণান ইবনে মাজা)
মাপ ও ওযনে কম দেওয়া :
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَأَقِيمُوا الْوَزْنَ بِالْقِسْطِ وَلَا تُخْسِرُوا الْمِيزَانَ “আর তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে ওযন প্রতিষ্ঠা কর এবং ওযনকৃত বস্তু কম দিও না।” (সূরা আর-রাহমান-৯) কাজেই ওযনে কম দেওয়া হচ্ছে অন্যতম একটা খারাপ আমল যা মানুষের ঈমান বিনষ্ট করে দেয়। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لأَصْحَابِ الْمِكْيَالِ وَالمِيزَانِ : إِنَّكُمْ قَدْ وُلِّيتُمْ أَمْرَيْنِ هَلَكَتْ فِيهِ أُمَمٌ سَالِفَةٌ قَبْلَكُمْ “রাসূল (সা.) মাপ ও ওযনের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয়কারী ব্যবসায়ীদেরকে সম্বোধন করে বললেন, তোমরা এমন দু’টো কাজের দায়িত্ব পেয়েছো, যার কারণে তোমাদের পূর্বে অতিবাহিত জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।” (সূনান আত-তিরমিযি)
মজুদদারী করা :
মজুদদারী করে বাজারে মালের কৃত্রিম সংকট তৈরী করা ঈমান বিনষ্টকারী খারাপ আমল। এর মাধ্যমে মানুষের অধিকার নষ্ট হয় বিধায় ইসলামে এটাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, الْجَالِبُ مَرْزُوقٌ ، وَالْمُحْتَكِرُ مَلْعُونٌ “যে ব্যক্তি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যথা সময়ে বাজারে সরবরাহ করে সে আল্লাহর রহমত ও অধিকতর জীবিকা লাভের যোগ্য। আর যে ব্যক্তি মজুদদারীতে লিপ্ত সে অভিশপ্ত।” (সূনান ইব্ন মাযা)
মানুষের চলাচলের পথ বন্ধ করা :
সমাজের মানুষ যে রাস্তা দিয়ে চলাচল করে সে পথ বন্ধ করে দেওয়া ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, عَنْ سَهْلِ بْنِ مُعَاذِ بْنِ أَنَسٍ الْجُهَنِىِّ عَنْ أَبِيهِ قَالَ غَزَوْتُ مَعَ نَبِىِّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم غَزْوَةَ كَذَا وَكَذَا فَضَيَّقَ النَّاسُ الْمَنَازِلَ وَقَطَعُوا الطَّرِيقَ فَبَعَثَ نَبِىُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مُنَادِيًا يُنَادِى فِى النَّاسِ أَنَّ مَنْ ضَيَّقَ مَنْزِلاً أَوْ قَطَعَ طَرِيقًا فَلاَ جِهَادَ لَهُ “হযরত সাহাল ইব্ন মুয়ায ইব্ন আনাস আল জুহানী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আমরা রাসূল (সা.) এর সাথে কোন এক যুদ্ধে গিয়েছিলাম। আমাদের সাথীরা এমন গাদাগাদি করে অবস্থান করতে লাগলো যে, চলাচলের রাস্তাই বন্ধ হয়ে গেলো। রাসূল (সা.) একজন ঘোষণাকারী পাঠিয়ে ঘোষণা করিয়ে দিলেন যে, যে ব্যক্তি অবস্থানস্থলকে সংকীর্ণ করে দেবে বা চলাচলের পথ বন্ধ করে দেবে, সে জিহাদের সওয়াব পাবে না।” (সূনান আবু দাউদ)
দান করে খোটা দেওয়া এবং লোক দেখানো দান করা :
ইসলামে নিঃস্বার্থভাবে দান করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা দান করে খোটা দেওয়া এবং লোক দেখানো আমল করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ “হে মু’মিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্ল¬াহ ও শেষ দিনের প্রতি।” (সূরা আল-বাকারা- ২৬৪)
অন্যের ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা ও দোষ অন্নেষণ করা :
মুমিন জীবনের আমল বিনষ্ট হওয়ার অন্যতম একটি খারাপ আমল হচ্ছে একজন মুসলিম অন্য মুসলিমের ব্যাপারে খারাপ ধারনা করা এবং দোষ অন্নেষণ করা। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ ، وَلاَ تَحَسَّسُوا ، وَلاَ تَجَسَّسُوا ، وَلاَ تَبَاغَضُوا ، وَلاَ تَدَابَرُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَانًا “কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না, কেননা খারাপ ধারণার ভিত্তিতে যে কথা বলা হবে, তা হবে সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা। অন্যদের সম্পর্কে তথ্য অনুসন্ধান করে বেড়িও না, গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত হয়ো না, দালালী করো না, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, পারস্পারিক সম্পর্ক ছিন্ন করো না। আল্লাহর বান্দা হয়ে থাক, পরস্পরে ভাই ভাই হয়ে জীবন-যাপন কর।” (সহীহ আল-বুখারী)
একে অন্যের গীবত করা :
একজন অন্য জনের গীবত করা ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমলের অন্যতম যা মানুষের ঈমানকে নিঃশেষ করে দেয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ “হে মু’মিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু।” (সূরা আল-হুজুরাত- ১২)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, لَمَّا عَرَجَ بِي رَبِّي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمِشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ فَقُلْتُ مَنْ هَؤُلاَءِ يَا جِبْرِيلُ قَالَ هَؤُلاَءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ وَيَقَعُونَ فِى أَعْرَاضِهِمْ “যখন আমার প্রভু আমাকে (মি’রাজের রাত্রে) আকাশে নিয়ে গেলেন, তখন আমি সেখানে এমন কিছু লোককে দেখতে পেলাম, যাদের নখ পিতলের তৈরী এবং তা দিয়ে তারা নিজেদের বুক ও মুখমন্ডল ক্ষতবিক্ষত করছিলো। আমি জিবরীলকে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? জিবরীল বললো, এরা দুনিয়ায় অন্য লোকের গোশত খেত এবং তাদের মান-সম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলতো।” (সূনান আবু দাউদ ও মুসনাদ আহমদ)
অহংকার করা :
অহংকার করা ঈমান বিনষ্টকারী একটি বর্জনীয় আমল। অহংকার করে দুনিয়ায় চলাফেরা করতে আল্লাহ তাআলা মানুষকে নিষেধ করেছেন। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا “আর জমিনে বড়াই করে চলো না; তুমি তো কখনো জমিনকে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড় সমান পৌঁছতে পারবে না।” (সূরা বনি ইসরাঈল- ৩৭)
আল্লাহ আরো বলেন, يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ تَنْفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ فَانْفُذُوا لَا تَنْفُذُونَ إِلَّا بِسُلْطَانٍ “হে জিন ও মানবজাতি, যদি তোমরা আসমানসমূহ ও জমিনের সীমানা থেকে বের হতে পার, তাহলে বের হও। কিন্তু তোমরা তো (আল্লাহর দেয়া) শক্তি ছাড়া বের হতে পারবে না।” (সূরা আর-রাহমান- ৩৩)
অহংকারের পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِى قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ قَالَ رَجُلٌ إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً قَالَ إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ “যার অন্তরে কণা পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে বেহেশতে যেতে পারবে না। এক ব্যক্তি বললো, মানুষতো চায়, তার কাপড় ভালো হোক, জুতা ভালো হোক। (এটাও কি অহংকার বলে গণ্য হবে?) রাসূল (সা.) বললেন, আল্লাহ সুন্দর ও পবিত্র। তিনি সৌন্দর্য, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতাকে পছন্দ করেন। অহংকার হলো আল্লাহর ইবাদত যথাযথভাবে না করা এবং তাঁর বান্দাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।”(সহীহ মুসলিম)

জীব-জন্তুর মধ্যে লড়াই বাধিয়ে দেওয়া :
জীব জন্তুর মধ্যে লড়াই বাধিয়ে দেওয়া ইসলামে জায়েজ নেই। বরং এর থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنِ التَّحْرِيشِ بَيْنَ الْبَهَائِمِ “হযরত ইব্ন আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) জীব-জন্তুর মধ্যে লড়াই বাধাতে নিষেধ করেছেন।”(সূনান আবু দাউদ ও তিরমিযি)
অপচয় ও অপব্যয় করা :
অপচয় ও অপব্যয় করা শয়তানের কাজ। তাই কোন মুমিনের উচিৎ নয় অপচয় ও অপব্যয় করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا “আর আত্মীয়কে তার হক দিয়ে দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরকেও। আর কোনভাবেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।” (সূরা বনি ইসরাঈল- ২৬-২৭)
এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ كُلْ مَا شِئْتَ وَالْبَسْ مَا شِئْتَ مَا أَخْطَأَتْكَ اثْنَتَانِ سَرَفٌ ، أَوْ مَخِيلَةٌ “হযরত ইব্ন আব্বাস (রা.) বলেন, যা ইচ্ছা খাও, যা খুশি পর, কেবল অপচয়-অপব্যয় ও অহংকার বর্জন করা চাই।” (সহীহ আল-বুখারী)

অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা :
অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা ঈমান ধ্বংসকারী সবচেয়ে বড় অপরাধ। আল-কুরআনে একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করাকে একটা জাতিকে হত্যা করার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا “যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া যে কাউকে হত্যা করলো, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করলো। আর যে তাকে বাঁচালো, সে যেন সব মানুষকে বাঁচালো।” (সূরা আল-মায়েদা- ৩২)
উপরোল্লেখিত খারাপ আমল ছাড়াও আরো অনেক ঈমান বিনষ্টকারী ও ঈমানের বৈসাদৃশ্যমুলক বর্জনীয় আমল রয়েছে যার বর্ণনা পরবর্তী পর্বে পেশ করব ইনশাআল্লাহ।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।


ইসলাম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত


১৫ বছরের কম বয়সী যে কেউ যদি টানা ৪০ দিন জামায়াতের সাথে ফজরের নামাজ আদা...

ইসলাম | 2017-10-14 10:37:41

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) এক ব্যক্তিকে...

ইসলাম | 2017-11-16 18:51:55

জীব জন্তু, সবই মহান আল্লাহর সৃষ্টি। মহান আল্লাহ তায়লা যেমনি মানব ও জ্ব...

ইসলাম | 2017-09-29 09:29:06

‘নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া/ আম্মাগো লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া/কাঁ...

ইসলাম | 2017-10-01 09:27:40

হযরত উবাদাতা ইবনে সামিত (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমরা যদ...

ইসলাম | 2017-10-03 10:59:56

যরত আবু হুরায়রা (রা.) রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন...

ইসলাম | 2017-10-12 20:30:54

সৌদি আরবের জেদ্দায় ৭৩টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত‘বাদশা আব্দুল আজিজ আল...

ইসলাম | 2017-10-14 21:31:12

ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দিনটির বিশেষ তাৎপর্য ও গুরুত্ব আমরা অনেকেই জ...

ইসলাম | 2017-11-02 19:34:28